একদিকে জলবায়ুর পরিবর্তন ও অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এ দুইয়ের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গম ও তুলার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে একই সময়ে কফি, চিনি, কোকো ও ভুট্টার দাম বেশ কমেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
ফিউচার ও কমোডিটি বাজার বিশেষজ্ঞ জাফর এরগেজেন জানান, এল নিনো আবহাওয়ার প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে অর্থনৈতিক ধাক্কা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে এটি উৎপাদন খরচও বাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে এবং সার ও জ্বালানির দাম বাড়ছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলের মূল্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তীব্র খরায় ধানের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জেরে শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) চালের দাম ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ভারতের কিছু অংশে কম বৃষ্টিপাতের কারণেও চাল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা মূল্যবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোয় তীব্র খরায় গমের দাম ১৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বুশেল গমের দাম ৬ ডলার ৮৮ সেন্টে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ।
খরার পাশাপাশি সারের আকাশচুম্বী দাম ও লজিস্টিকস সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে গম চাষ রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। এর বাইরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান গম উৎপাদনকারী দেশ অস্ট্রেলিয়ায়ও বৃষ্টিপাত কমে গেছে। ফলে দেশটির গমের ফলন নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে দাম আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ববাজারে দরবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের চাক্তাই চাল মিল মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর আজম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে নতুন মৌসুমের ধান ও চাল উঠেছে। তাই আপাতত চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। ফলে চালের বৈশ্বিক মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে দেশের বাজারে প্রভাব পড়বে না।’
তবে গমের বুকিং বাড়লে দেশে আটা-ময়দার বাজারে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে খরা ও তীব্র শীতের (তুষারপাত) ঝুঁকির কারণে তুলার দাম ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি খরচ বাড়ায় কৃত্রিম সুতা বা পলিয়েস্টার তৈরির খরচও অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণে পোশাক ও টেক্সটাইল উৎপাদকরা ফের প্রাকৃতিক তুলার দিকে ঝুঁকছেন, যা চাহিদা ও দাম দুটিই বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতেও কম বৃষ্টিপাতে তুলা উৎপাদন কমেছে।
বাংলাদেশ কটন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএ) মনজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম বাড়ার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর। ভারতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলক কম হবে। কারণ তাদের নিজস্ব বাজার বড় এবং দেশীয় সুতার বাজারও শক্তিশালী। কিন্তু বাংলাদেশে এখন এমনিতেই রফতানি আদেশ কমে গেছে, আবার সুতারও কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন,"’গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম প্রায় ৬ সেন্ট বেড়েছে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৫-১০ শতাংশ। ফলে সুতার বাজারে প্রভাব পড়বে। সুতার দাম যদি সে অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে স্পিনিং মিলগুলোর লোকসান হবে। তুলার দাম বাড়লে আমদানিও কিছুটা কমে আসতে পারে বলে জানান তিনি।
তবে চাল, গম ও তুলার দাম বাড়লেও কফি, চিনি, কোকো ও ভুট্টার বাজার এখন নিম্নমুখী। ভিয়েতনামের কফি রফতানি বৃদ্ধি এবং ব্রাজিলে রেকর্ড ৭ কোটি ১৯ লাখ ব্যাগ কফি উৎপাদনের পূর্বাভাসের কারণে কফির দাম ১৫ শতাংশ কমেছে। প্রতি পাউন্ড কফির দাম কমে ২ ডলার ৩৮ সেন্টে নেমেছে।
এদিকে ব্রাজিলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে চিনি সরবরাহ বেড়েছে। ফলে এর দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি পাউন্ড দশমিক ১৩ সেন্টে নেমে এসেছে। এটি ২০২০ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন দাম।
পশ্চিম আফ্রিকায় ভালো ফলনের সম্ভাবনা এবং বাজারে দুর্বল চাহিদার কারণে কোকোর দামও ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি টন ২ হাজার ৮৪৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন দাম। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা প্রশমন এবং আর্জেন্টিনায় দ্রুত ফসল কাটার কারণে ভুট্টার দাম ১ শতাংশ কমেছে। এছাড়া সারের উচ্চমূল্য ও চীনের শক্তিশালী চাহিদার কারণে সয়াবিনের দাম ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।